সন্ধ্যা নামার ঠিক আগ মুহূর্তের আলোয় গ্রামের ছোট্ট নদীটার রূপ
সন্ধ্যা নামার ঠিক আগ মুহূর্তের আলোয় গ্রামের ছোট্ট নদীটার রূপ অন্যরকম হয়ে ওঠে। নদীর ধারের পুরোনো বটবৃক্ষটির নিচে প্রতিদিন বিকেলে এসে বসেন বৃদ্ধ রহমান সাহেব। তাঁর বয়স হয়েছে, চোখের দৃষ্টি কিছুটা কমেছে, কিন্তু স্মৃতির পাতাগুলো এখনও ঝকঝকে।
রহমান সাহেবের নিত্যদিনের সঙ্গী একদল দুরন্ত শিশু। বিকেলে পড়াশোনা শেষ করে তারা ছুটে আসে তাঁর কাছে। আজকেও সবাই গোল হয়ে ঘিরে বসল তাঁকে। ছোট্ট রিমঝিম কৌতূহলী চোখে বলল, "দাদাভাই, আজ আমাদের একটা রাজু-রূপকথার গল্প শোনান না!"
রহমান সাহেব মৃদু হেসে নিজের চশমাটা ঠিক করলেন এবং দূরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন—
### তারার দেশের খোকা
বহু দিন আগের কথা, এক সুন্দর গ্রামে এক অভাবী কিন্তু হাসিখুশি খোকা থাকত। তার নাম ছিল অয়ন। অয়নের কোনো খেলনা ছিল না, রূপার চামচ বা সুন্দর কাপড়ও ছিল না। কিন্তু তার একটি দারুণ গুণ ছিল—সে সারাদিন নানা সুর গুনগুন করত এবং বনের পাখি, ঝিরিঝিরি হাওয়া আর নদীর ঢেউয়ের সাথে কথা বলতে পারত।
গ্রামের মানুষের বিশ্বাস ছিল, অয়নের গলা দিয়ে যখন গান বের হয়, তখন আকাশ থেকে তারারা আরও কাছে নেমে এসে কান পেতে শোনে।
একদিন খুব শীতের রাত। গ্রামের সব মানুষ কম্বলের নিচে উষ্ণতায় ঘুমাচ্ছে। অয়ন তার ভাঙা জানালার পাশে বসে আকাশ দেখছিল। হঠাৎ সে দেখল, রাতের আকাশ থেকে একটা ছোট তারা খসে মাটিতে এসে পড়ল গ্রামের ঠিক পাশের ধূসর মাঠে।
অয়ন আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে একটা ছোট্ট লণ্ঠন হাতে নিয়ে ছুটে গেল মাঠের দিকে। মাঠে গিয়ে সে দেখল, একটি সোনালী তারা মাটির ওপর শুয়ে থরথর করে কাঁপছে। তারাটি ম্লান হয়ে আসছিল।
অয়ন দৌড়ে গিয়ে তারাটিকে আলতো করে কুঁড়োলে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরল। সে ফিসফিস করে বলল, "ভয় পেও না, আমি তোমাকে তাপ দেব।"
অয়নের বুকের ওম আর তার ভালোবাসার সুর পেয়ে তারাটির গায়ে আবার সোনালী আলো ফিরে এল। তারাটি আনন্দে নেচে উঠে খিলখিল করে হেসে উঠল এবং মানুষের ভাষায় বলে উঠল, "অয়ন, তুমি আমায় বাঁচিয়েছ। বলো, তোমার কী চাই?"
অয়ন একটু ভেবে বলল, "আমার নিজের জন্য কিছু চাই না। শুধু আমার গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জীবনে যেন কোনো দুঃখ না থাকে, তাদের মুখে যেন সবসময় হাসি থাকে।"
তারাটি মুচকি হেসে বলল, "তোমার মনটা খুব বড়, অয়ন। কিন্তু এই জাদু আমি একা করতে পারব না। এটার জন্য তোমার গান আর আমার আলো একসঙ্গে কাজ করবে।"
পরদিন সকালে ঘুম ভেঙে গ্রামের মানুষ দেখল এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। সারা গ্রামের মাঠে মাঠে সোনালী ফুলের মেলা বসেছে, যা থেকে মিষ্টি সুবাস ছড়াচ্ছে এবং সূর্যের আলো পড়লেই মুক্তার মতো চকচক করছে। সেই ফুল বিক্রি করে গ্রামের সব মানুষের অভাব চিরতরে দূর হয়ে গেল। সবাই বুঝতে পারল, এটা অয়নের নিঃস্বার্থ ভালোবাসারই ফল।
গল্প শেষ করে রহমান সাহেব চারপাশের শিশুদের দিকে তাকালেন। রিমঝিম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "দাদাভাই, তারাটি কি আজও আছে?"
রহমান সাহেব রিমঝিমের মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহের হাসিতে বললেন, "হ্যাঁ রেমা, তারাটি এখনো আছে। সে আমাদের সবার মনের ভেতরে আলো হয়ে জ্বলে, যখনই আমরা কাউকে ভালোবেসে নিঃস্বার্থ কিছু করি।"
শিশুরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গল্পটি শুনল। ততক্ষণে আকাশে একে একে তারা উঠতে শুরু করেছে, যেন রহমান সাহেবের গল্পের তারাগুলোর সাথেই তারা মিটিমিটি হাসছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন