শেষ রোদের আলো


 

শেষ রোদের আলো

​ঢাকা শহরের একটি পুরোনো গলি। রিকশার ঘণ্টি, দূর থেকে ভেসে আসা ট্রাফিকের আওয়াজ আর ক্লান্ত দুপুরের স্তব্ধতা—সব মিলিয়ে এক চেনা আবহ। পুরোনো এক দোতলা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে অয়ন। পরনে সাধারণ সাদা শার্ট, চোখে ঝাপসা দৃষ্টি, কিন্তু মুখের কোণে জমে আছে বহু বছরের না বলা কথার ভারী এক দীর্ঘশ্বাস।

​হঠাৎ করেই কড়া নাড়ার শব্দ।

​দরজা খুলতেই অয়নের চোখের সামনে ভেসে ওঠে অবয়বটি—মেঘলা। ঠিক দশ বছর আগে যে মেয়েটি এই শহরের আকাশ ছেড়ে বহু দূরে হারিয়ে গিয়েছিল, আজ ঠিক তেমনি এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে সে আবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সময়ের পটে বয়সের হালকা ছাপ, কিন্তু চোখের সেই পরিচিত দীপ্তি আজও অপরিবর্তিত।

​– "আমাকে চিনতে পেরেছ, অয়ন?"—মেঘলার কন্ঠস্বর কাঁপছিল।

​অয়ন যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। সে শুধু একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল।

​ফ্ল্যাশব্যাক: দশ বছর আগে

​বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর। বৃষ্টি পড়ছে ঝুমঝুম করে। একটি ছাতার নিচে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটি তরুণ-তরুণী।

– "অয়ন, আমরা কি সত্যিই কখনো আলাদা হতে পারব না?"—জিজ্ঞাসা করেছিল মেঘলা।

– "যতদিন এই পৃথিবীর আকাশে মেঘ জমবে, ততদিন আমাদের গল্প ফুরোবে না,"—মুচকি হেসে জবাব দিয়েছিল অয়ন।

​কিন্তু জীবন তো আর রূপকথা নয়। পারিবারিক বাধা, ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতা আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে একদিন তাদের পথ দুই দিকে বেঁকে যায়। মেঘলাকে চলে যেতে হয় সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে। যাওয়ার আগে সে শুধু একটি চিঠি রেখে গিয়েছিল— "আমাদের গল্পটা অসমাপ্তই রইল, অয়ন। হয়তো অন্য কোনো জন্মে।"

​বর্তমান

​বারান্দার টেবিলে রাখা চায়ের কাপ থেকে তখনো ধোঁয়া উঠছে। দুইজনে মুখোমুখি বসা। মাঝখানের এই দীর্ঘ দশটি বছরের দূরত্ব যেন এক লহমায় মিলিয়ে গেছে।

​– "কেন এলে মেঘলা? আবার কি চলে যাওয়ার জন্যই ফিরে আসা?"—অয়নের কন্ঠে জমাট বাঁধা অভিমান।

– "না, অয়ন। এবার আর পালিয়ে যাওয়ার জন্য নয়। জীবনের বাকি পথটা না হয় এই অসমাপ্ত গল্পটাকেই সত্যি করার চেষ্টা করলাম,"—মেঘলা তার হাত বাড়িয়ে দিল অয়নের দিকে। তার চোখের কোণে জমল এক ফোঁটা মুক্তোঝরা জল।

​বাইরে তখন হঠাৎ করেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। শহরের ব্যস্ততা থমকে গেল। অয়ন আর মেঘলা দুজনে বারান্দার রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দশ বছর আগের সেই বৃষ্টির ছাঁট আজ যেন তাদের গায়ে এসে আবার নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা করছে।

​ক্যামেরা ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠতে থাকে—বৃষ্টিসিক্ত ঢাকা শহরের আকাশ জুড়ে তখন এক অদ্ভুত রূপালি আলো। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটি শব্দ: চলমান...

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিবেক কে সুস্থ রাখুন: